অক্ষয় তৃতীয়া কি ? এই দিন কি কাজ শুভ আর কি কাজ অশুভ ? জানুন
অক্ষয় তৃতীয়া কী?
বৈশাখ মাসের শুক্লপক্ষের তৃতীয়া তিথিকে অক্ষয় তৃতীয়া বলা হয়। বৈদিক বিশ্বাস অনুযায়ী, এই পবিত্র তিথিতে যা কিছু করা হয়, তার ফল কখনও ক্ষয় হয় না—অর্থাৎ তা অনন্তকাল 'অক্ষয়' থাকে। এ দিন ভালো কাজ করলে যেমন অক্ষয় পুণ্য লাভ হয়, তেমনই কোনো খারাপ কাজ করলে তার পাপের ভাগও অক্ষয় হয়ে থাকে।
পৌরাণিক ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব:
যুগের সূচনা: অনেকের মতে এই দিনে সত্যযুগ শেষ হয়ে ত্রেতাযুগ শুরু হয়েছিল।
ধর্মগ্রন্থ: মহর্ষি বেদব্যাস এই দিনেই গণেশকে দিয়ে মহাভারত লেখানো শুরু করেছিলেন।
গঙ্গা ও পরশুরাম: পুরাণ অনুযায়ী, এই তিথিতেই গঙ্গা মর্ত্যে অবতীর্ণ হয়েছিলেন এবং ভগবান বিষ্ণুর ষষ্ঠ অবতার পরশুরামের জন্ম হয়েছিল।
অক্ষয় পাত্র: শ্রীকৃষ্ণ পান্ডবদের বনবাসের সময় এই দিনে দ্রৌপদীকে 'অক্ষয় পাত্র' দান করেছিলেন, যে পাত্রের খাবার কখনও শেষ হতো না।
মন্দির: উত্তরাখণ্ডের বদ্রীনাথ মন্দিরের দ্বার এই বিশেষ দিনে খোলা হয় এবং চন্দনযাত্রা উৎসব শুরু হয়।
পালনীয় রীতি ও নিয়ম:
১. পূজা ও স্নান: সকালে গঙ্গাস্নান (না পারলে বাড়িতে গঙ্গার জল মিশিয়ে স্নান) সেরে বিষ্ণু ও লক্ষ্মীর পূজা করা হয়। চন্দন মাখানো তুলসী পাতা দিয়ে বিষ্ণুর পূজা করা অত্যন্ত শুভ।
২. দান-ধ্যান: এদিন অন্ন, জল, পাখা, ছাতা বা বস্ত্র দান করাকে মহা পুণ্যের কাজ মনে করা হয়।
৩. কেনাকাটা ও বিনিয়োগ: সোনা বা রুপো কেনা সবচেয়ে শুভ বলে ধরা হয়। তবে সামর্থ্য না থাকলে মাটির পাত্র, লবণ বা অন্য কোনো ধাতু কিনলেও সমৃদ্ধি আসে। নতুন ব্যবসা বা গৃহপ্রবেশের জন্যও এটি বিশেষ শুভ দিন।
অক্ষয় তৃতীয়ার পুণ্য লগ্নে জীবন ও সংসারে শুভ শক্তি সঞ্চারের জন্য বেশ কিছু কাজের বিধান শাস্ত্রে দেওয়া হয়েছে। আপনার শেয়ার করা লিঙ্কের তথ্যের পাশাপাশি প্রচলিত ঐতিহ্য অনুযায়ী কী কী করলে শুভ ফল পাওয়া যায়, তার একটি তালিকা নিচে দেওয়া হলো:
এইদন কি কাজ আপনার জন্য শুভ ?
আধ্যাত্মিক ও মাঙ্গলিক কাজ
সকালে গঙ্গাস্নান: এই দিন গঙ্গাস্নান করা অত্যন্ত পুণ্যের। যদি গঙ্গায় যাওয়া সম্ভব না হয়, তবে বাড়িতে স্নানের জলেই সামান্য গঙ্গাজল মিশিয়ে স্নান সেরে নিতে পারেন।
লক্ষ্মী-নারায়ণ পূজা: এদিন ভগবান বিষ্ণু ও মা লক্ষ্মীর পূজা করা প্রধান কর্তব্য। নারায়ণের চরণে চন্দনের ফোঁটা দেওয়া এবং তুলসী অর্পণ করা অত্যন্ত শুভ। এছাড়া সম্পদের দেবতা কুবের এবং সিদ্ধিদাতা গণেশের পূজাও করা হয়।
অক্ষয় প্রদীপ প্রজ্বলন: সন্ধ্যাবেলায় ঠাকুরঘরে ঘিয়ের প্রদীপ জ্বালিয়ে আরতি করুন। মনে করা হয়, এই প্রদীপের আলো অশুভ শক্তি দূর করে সংসারে শান্তি আনে।
অন্নপূর্ণা পূজা: যেহেতু এদিন দেবী অন্নপূর্ণার জন্মতিথি, তাই অনেক বাড়িতেই এদিন অন্নপূর্ণার পূজা করা হয় যাতে সারাবছর ঘরে অন্নের অভাব না হয়।
দান ও সমাজসেবা
অন্ন ও জল দান: বৈশাখ মাসের তীব্র গরমে তৃষ্ণার্তকে জল বা ছাতুর শরবত খাওয়ানো এবং ক্ষুধার্তকে অন্ন দান করা এই তিথির অন্যতম সেরা পুণ্য কাজ।
প্রয়োজনীয় বস্তু দান: শাস্ত্র অনুযায়ী এদিন পাখা, ছাতা, পাদুকা (জুতো) এবং বস্ত্র দান করলে অশুভ গ্রহের দোষ খণ্ডন হয় এবং অক্ষয় পুণ্য লাভ হয়।
সমৃদ্ধি ও আর্থিক উন্নতি
সোনা বা ধাতু কেনা: সামর্থ্য থাকলে সোনা বা রুপো কেনা খুব শুভ। তবে যদি তা সম্ভব না হয়, তবে যে কোনো নিত্যপ্রয়োজনীয় নতুন ধাতব বাসন বা লক্ষ্মীর কড়ি কিনলেও ঘরে সমৃদ্ধি আসে।
নতুন কাজের সূচনা: ব্যবসা শুরু করা, হালখাতা খোলা, গৃহপ্রবেশ বা জমি ক্রয়ের মতো শুভ কাজের জন্য এটি বছরের অন্যতম শ্রেষ্ঠ 'অবুঝ মুহূর্ত' (অর্থাৎ পঞ্জিকা না দেখেও শুভ কাজ করা যায় এমন সময়)।
বিনিয়োগ: দীর্ঘমেয়াদী কোনো সঞ্চয় বা স্কিমে বিনিয়োগ শুরু করার জন্য অক্ষয় তৃতীয়াকে আদর্শ মনে করা হয়।
ব্যক্তিগত আচরণ
অহিংসা ও মৌনতা: এই দিনে যতটা সম্ভব পরনিন্দা ও পরচর্চা এড়িয়ে চলা উচিত। সংযম ও ভক্তির মাধ্যমে দিনটি অতিবাহিত করলে মানসিক শান্তি অক্ষয় হয়।
এয়োতিদের সম্মান: বিবাহিত মহিলাদের আলতা বা সিঁদুর উপহার দেওয়া সৌভাগ্যের প্রতীক বলে মনে করা হয়।
সংক্ষেপে, এদিন স্বার্থহীন সেবা, ভক্তি এবং নতুন কিছুর পজিটিভ সূচনা করাই হলো আসল উদ্দেশ্য। এটি এমন একটি দিন যা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, ভালো কাজের সুফল কখনও শেষ হয় না।
এইদিন কি কাজ করলে অশুভ হবে ?
সতর্কতা:
অক্ষয় তৃতীয়ার পুণ্য তিথিতে যেমন কিছু কাজ করা অত্যন্ত শুভ, তেমনই শাস্ত্রীয় মতে কিছু কাজ বর্জন করা উচিত। সনাতনী বিশ্বাস অনুযায়ী, এই দিনে যে কাজগুলো করা উচিত নয় তা নিচে দেওয়া হলো:
অশুচি অবস্থায় তুলসী স্পর্শ: স্নান না করে বা অপরিষ্কার শরীরে তুলসী পাতা ছেঁড়া বা তুলসী গাছ স্পর্শ করা একদম উচিত নয়। তুলসী ভগবান বিষ্ণুর অত্যন্ত প্রিয়, তাই অশুচি অবস্থায় এটি করলে দেবী লক্ষ্মী রুষ্ট হতে পারেন।
অসংযত বাক্য ও ক্রোধ: যেহেতু এই দিনের প্রতিটি কাজের ফল 'অক্ষয়' থাকে, তাই কারো সাথে ঝগড়া করা, গালিগালাজ করা বা কাউকে মনে কষ্ট দিয়ে কথা বলা উচিত নয়। এদিন যতটা সম্ভব শান্ত ও মৌন থাকা ভালো।
অপরিচ্ছন্নতা: ঘরবাড়ি বা ঠাকুরঘর অপরিষ্কার রাখবেন না। মনে করা হয়, যেখানে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও শান্তি থাকে, সেখানেই মা লক্ষ্মী স্থায়ীভাবে বিরাজ করেন।
লোভ ও অধর্মীয় আচরণ: কোনো প্রকার অনৈতিক কাজ বা অন্যের ক্ষতি করার পরিকল্পনা এদিন করবেন না। লোভ সংবরণ করে ঈশ্বরের আরাধনায় মনোনিবেশ করা উচিত।
লবণ খাওয়া (ব্রতীদের জন্য): যারা এদিন বিশেষভাবে ব্রত পালন করেন, তাদের নুন বা লবণ খাওয়া এড়িয়ে চলা উচিত। তবে বাড়িতে সন্ধক লবণ রাখা শুভ বলে মনে করা হয়।
মাঝপথে ব্রত ভঙ্গ: যদি আপনি কোনো সংকল্প বা ব্রত শুরু করেন, তবে তা শেষ না করে মাঝপথে উপবাস ভাঙা বা নিয়ম লঙ্ঘন করা উচিত নয়।
অশুভ কাজ: এদিন কোনো অশুভ বা নেতিবাচক চিন্তা মাথায় আনা উচিত নয়। এমনকি নতুন বাড়ি তৈরির কাজ (নির্মাণ কাজ) শুরু করার ক্ষেত্রেও কিছু কিছু শাস্ত্রে নিষেধ থাকে, যদিও নতুন বাড়ি কেনা শুভ।
উপসংহার:
অক্ষয় তৃতীয়া মূলত সমৃদ্ধি ও আধ্যাত্মিক উন্নতির দিন। ব্যবসায়ীরা এদিন 'হালখাতা' বা নতুন খাতা খোলেন এবং দেবী অন্নপূর্ণার পূজা করেন। এটি কেবল সোনা কেনার দিন নয়, বরং দান ও সংযমের মাধ্যমে অক্ষয় পুণ্য অর্জনের একটি বিশেষ সুযোগ।
