কত টাকা বতন পেতেন বন্দেমাতরম এর স্রস্টা ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র ?
✍️ ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়: জন্মজয়ন্তীতে বিনম্র শ্রদ্ধা ও কিছু অজানা কথা
আজ (২৬শে জুন) বাংলা সাহিত্যের 'সাহিত্য সম্রাট' এবং ভারতের জাতীয় অ্যানথেম স্রষ্টা ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের জন্মদিন। ১৮৩৮ সালের এই দিনে উত্তর চব্বিশ পরগনার নৈহাটিতে জন্মগ্রহণ করেছিলেন এই মহাপুরুষ। তাঁর ক্ষুরধার লেখনী শুধু বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেনি, বরং পরাধীন ভারতকে দিয়েছিল আত্মমর্যাদা ও স্বাধীনতার নতুন চেতনা।
আজকের এই বিশেষ দিনে তাঁর কালজয়ী সৃষ্টির পাশাপাশি জেনে নেওয়া যাক তাঁর জীবন ও কাজ সম্পর্কিত কিছু অল্প জানা তথ্য:
🔹 প্রথম গ্র্যাজুয়েট ও ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট
আমরা অনেকেই জানি বঙ্কিমচন্দ্র একজন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন। কিন্তু মজার তথ্য হলো, তিনি ও যদুনাথ বোস ছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের প্রথম দুই গ্র্যাজুয়েট (B.A.)। ১৮৫৮ সালের এই পরীক্ষায় মাত্র দুজনই উত্তীর্ণ হতে পেরেছিলেন।
🔹 প্রথম উপন্যাস ছিল ইংরেজিতে!
বাংলা সাহিত্যের সম্রাট হলেও বঙ্কিমচন্দ্রের প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস কিন্তু বাংলা ছিল না। তাঁর প্রথম উপন্যাসটির নাম 'Rajmohan's Wife' (রাজমোহনস ওয়াইফ)। এটি ১৮৬৪ সালে একটি পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়েছিল। এর পরের বছর (১৮৬৫) তাঁর প্রথম বাংলা উপন্যাস 'দুর্গেশনন্দিনী' প্রকাশিত হয়ে বাংলা সাহিত্যের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
🔹 'বন্দে মাতরম্' এবং একটি ভবিষ্যদ্বাণী
১৮৭৫ সালের দিকে তিনি যখন 'বন্দে মাতরম্' গানটি রচনা করেন, তখন অনেকেই এর মহত্ব বুঝতে পারেননি। এমনকি তাঁর কন্যা যখন গানটির অর্থ বুঝতে না পেরে সামান্য টিপ্পনী কাটেন, বঙ্কিমচন্দ্র গম্ভীর হয়ে বলেছিলেন— "আমি আজ যা লিখলাম, তা হয়তো তোমরা এখন বুঝবে না। কিন্তু একদিন এই গানটি পুরো ভারতবর্ষকে জাগিয়ে তুলবে।" পরবর্তীতে তাঁর এই ভবিষ্যদ্বাণী অক্ষরে অক্ষরে সত্য প্রমাণিত হয়েছিল।
🔹 ট্রেনের কামরায় 'বন্দে মাতরম্' গানের সুর
বঙ্কিমচন্দ্র যখন সরকারি চাকুরিসূত্রে চুঁচুড়ায় যাতায়াত করতেন, তখন ট্রেনের কামরায় বসেই তিনি এই ঐতিহাসিক গানের বেশ কিছু পঙ্ক্তি লিখেছিলেন বলে শোনা যায়। পরে এটি তাঁর বিখ্যাত 'আনন্দমঠ' (১৮৮২) উপন্যাসের অন্তর্ভুক্ত হয়।
🔹 সরকারি চাকুরি বনাম স্বাধীনচেতা মন
পেশায় ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে অত্যন্ত কড়া এবং ন্যায়পরায়ণ অফিসার ছিলেন তিনি। ব্রিটিশ সরকারের অধীনে কাজ করলেও তিনি কখনো নিজের আত্মসম্মান বিসর্জন দেননি। বহুবার ব্রিটিশ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সাথে তাঁর মতবিরোধ হয়েছিল এবং তিনি সাহসের সাথে নিজের অবস্থানে অনড় ছিলেন। এই অনমনীয় ব্যক্তিত্বের কারণেই তিনি 'ঋষি' উপাধিতে ভূষিত হন।
🔹 'বঙ্গদর্শন' ও নতুন লেখক তৈরির কারখানা
১৮৭২ সালে তাঁর সম্পাদিত 'বঙ্গদর্শন' পত্রিকা প্রকাশিত হওয়ার পর বাংলা সাহিত্য জগতে এক অভূতপূর্ব জোয়ার আসে। এই পত্রিকাটি শুধু তাঁর নিজের সৃষ্টির প্রকাশ মাধ্যম ছিল না, বরং তৎকালীন তরুণ লেখকদের জন্য একটি মস্ত বড় মঞ্চ ছিল। সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় থেকে শুরু করে তরুণ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও এই পত্রিকার গুণগ্রাহী ও লেখক ছিলেন।
💰 ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে তাঁর বেতন কত ছিল?
বঙ্কিমচন্দ্র দীর্ঘ ৩৩ বছর (১৮৫৮-১৮৯১) অত্যন্ত সততা ও দক্ষতার সাথে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ও ডেপুটি কালেক্টর হিসেবে ব্রিটিশ সরকারের চাকরি করেছেন।
১৮৫৮ সালে যখন তিনি প্রথম চাকরিতে যোগ দেন (যশোহরে), তখন তাঁর প্রাথমিক মাসিক বেতন ছিল ২০০ টাকা (তৎকালীন সময়ে যা ছিল এক বিশাল অঙ্কের অর্থ)।
পরবর্তীতে কর্মদক্ষতার কারণে তাঁর পদোন্নতি হয় এবং অবসরের ঠিক আগে তিনি সরকারের কাছ থেকে প্রতি মাসে ৮০০ থেকে ১০০০ টাকা পর্যন্ত বেতন পেতেন।
১৮৯১ সালে যখন তিনি চাকরি থেকে অবসর নেন, তখন তাঁর মাসিক পেনশন নির্ধারিত হয়েছিল ৪০০ টাকা।
🤒 কি কারণে তাঁর মৃত্যু হয়েছিল?
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় মাত্র ৫৫ বছর বয়সে, ১৮৯৪ সালের ৮ই এপ্রিল কলকাতায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর অকাল মৃত্যুর প্রধান কারণ ছিল অনিয়ন্ত্রিত বহুমূত্র রোগ (Diabetes)। জীবনের শেষ কয়েক বছর তিনি এই রোগে মারাত্মক কষ্ট পেয়েছিলেন। শেষ দিকে পায়ে গ্যাংগ্রিন (পচন) দেখা দিয়েছিল এবং সেই সাথে মূত্রাশয়ের তীব্র ইনফেকশন তাঁর মৃত্যুকে ত্বরান্বিত করে।
বঙ্কিমচন্দ্র অত্যন্ত স্পষ্টভাষী এবং আত্মমর্যাদাসম্পন্ন মানুষ ছিলেন, যার কারণে অনেকের সাথেই তাঁর মানসিক দূরত্ব তৈরি হয়েছিল:
ব্রিটিশ সরকারের সাথে সংঘাত: বঙ্কিমচন্দ্রের সবচেয়ে খারাপ সম্পর্ক ছিল ব্রিটিশ বহুল আলোচিত ও অত্যাচারী ম্যাজিস্ট্রেট ডোনাল্ড ম্যাকফরল্যান (Donald Macfarlane)-এর সাথে। বারুইপুরে পোস্টিং থাকাকালীন ম্যাকফরল্যান ভারতীয়দের চরম অপমান করতেন। একদিন বঙ্কিমচন্দ্র পালকিতে করে যাওয়ার সময় ম্যাকফরল্যান তাঁকে জোর করে নামানোর চেষ্টা করেন। বঙ্কিমচন্দ্র এর বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেন এবং শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশ অফিসার ক্ষমা চাইতে বাধ্য হন। এই ঘটনার পর ব্রিটিশ সরকার বঙ্কিমচন্দ্রকে বারবার দূর-দূরান্তে বদলি করে হেনস্থা করার চেষ্টা করত।
দীনবন্ধু মিত্রের সাথে রসিকতা ও মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব: 'নীলদর্পণ' খ্যাত নাট্যকার দীনবন্ধু মিত্র বঙ্কিমচন্দ্রের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। কিন্তু দীনবন্ধুর কিছু অতিরিক্ত খোলামেলা নাটক ও লেখার ধরন নিয়ে বঙ্কিমচন্দ্র প্রকাশ্যে সমালোচনা করেছিলেন, যা নিয়ে সাময়িকভাবে তাঁদের সম্পর্কে কিছুটা তিক্ততা তৈরি হয়েছিল, যদিও পরে তা মিটে যায়।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাথে তীব্র বিতর্ক: তরুণ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাথে বঙ্কিমচন্দ্রের সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত কৌতূহলোদ্দীপক। একদিকে রবীন্দ্রনাথ তাঁকে গুরু মানতেন, অন্যদিকে তাঁদের মধ্যে 'আন্দোলন' ও 'হিন্দুধর্ম' নিয়ে সংবাদপত্রের পাতায় তীব্র মতাদর্শগত বিতর্ক (কলমযুদ্ধ) হয়েছিল। বঙ্কিমচন্দ্রের রক্ষণশীল সনাতন ভাবধারার বিপরীতে রবীন্দ্রনাথের ব্রাহ্ম ভাবধারার কারণে বেশ কিছুদিন তাঁদের মধ্যে সম্পর্কের ঠান্ডা লড়াই চলেছিল। তবে বঙ্কিমচন্দ্রের মৃত্যুর পর রবীন্দ্রনাথই তাঁর স্মরণে অন্যতম শ্রেষ্ঠ শ্রদ্ধাঞ্জলিটি লিখেছিলেন।
🚬 বঙ্কিমচন্দ্রের কিছু অল্প জানা ব্যক্তিগত অভ্যাস
পড়াশোনা ও লেখার সময় তামাকের নেশা: বঙ্কিমচন্দ্র যখন লিখতে বসতেন, তখন তাঁর এক হাতে বা পাশে সবসময় 'হুঁকো' (তামাক) থাকত। তিনি তামাকের ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে গভীর চিন্তায় মগ্ন হতেন। সারাদিনের সরকারি কাজের ক্লান্তি তিনি দূর করতেন তামাক আর চা খেয়ে।
নিশাচর লেখক: তিনি দিনের আলোয় প্রশাসনিক কাজ সামলাতেন আর গভীর রাতে, যখন চারদিক নিস্তব্ধ হয়ে যেত, তখন মোমবাতি বা হ্যারিকেনের আলোয় লিখতে বসতেন। তাঁর বেশির ভাগ কালজয়ী উপন্যাস মধ্যরাত থেকে ভোর রাতের মধ্যে লেখা।
পোশাক নিয়ে কড়া নিয়ম: তিনি ইউরোপীয় পোশাক (কোট-প্যান্ট) তীব্র অপছন্দ করতেন। আদালতে বা সরকারি অফিসে বাধ্য হয়ে চোগা-চাপকান পরলেও, বাড়িতে বা সাহিত্য আড্ডায় তিনি সবসময় ধুতি এবং সাধারণ চাদর পরতে ভালোবাসতেন। কোনো বাঙালি কোট-প্যান্ট পরে তাঁর সাথে দেখা করতে এলে তিনি মনে মনে বিরক্ত হতেন।
তীব্র মাথাব্যথার রোগী: বঙ্কিমচন্দ্র সারা জীবনই মাইগ্রেন বা তীব্র মাথাব্যথায় ভুগেছেন। অতিরিক্ত মানসিক পরিশ্রমের কারণে প্রায়ই তিনি অসুস্থ হয়ে পড়তেন। ডায়েরিতে বা চিঠিতে তিনি বহুবার এই মাথাব্যথার কারণে কাজ থমকে যাওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন।
"তুমি শুধু সাহিত্যের সম্রাট নও, তুমি আমাদের জাতীয় চেতনার মূর্ত প্রতীক।"
আজকের এই পবিত্র দিনে বাংলা ভাষা ও ভারতীয় সংস্কৃতির এই কালজয়ী রূপকারকে জানাই আমাদের গভীর শ্রদ্ধা ও প্রণাম। 🙏✨
