দেবী বিপত্তারিণী পূজার ইতিহাস ও অর্থ সহ পূজার মন্ত্র
হিন্দু ধর্মে মা বিপত্তারিণী হলেন দেবী দুর্গারই একটি বিশেষ রূপ, যিনি ভক্তদের সমস্ত বিপদ থেকে রক্ষা করেন। বিশেষ করে বাঙালি সনাতন স্বাবলম্বী নারীদের মধ্যে এই ব্রত পালনের ব্যাপক প্রচলন রয়েছে। আষাঢ় মাসের শুক্লপক্ষের দ্বিতীয়া (রথযাত্রা) থেকে দশমীর (উল্টো রথ) মধ্যে যেকোনো শনি বা মঙ্গলবার এই ব্রত পালন করা হয়।
মা বিপত্তারিণীর পূজায় সাধারণত দুর্গাপূজার পুষ্পাঞ্জলি মন্ত্র এবং দেবী আদিশক্তির আরাধনার বৈদিক মন্ত্রসমূহ ব্যবহার করা হয়। নিচে মায়ের পুষ্পাঞ্জলি মন্ত্র, প্রণাম মন্ত্র এবং ব্রতের সুতো (তাগা) ধারণের বিশেষ মন্ত্র দেওয়া হলো:
ওঁ সর্বমঙ্গলমঙ্গল্যে শিবে সর্বার্থসাধিকে।শরণ্যে ত্র্যম্বকে গৌরি নারায়ণি নমোহস্তু তে।।
- উচ্চারণ অর্থ: হে দেবী, তুমি সর্বমঙ্গলের মঙ্গলস্বরূপা, কল্যাণদায়ী এবং সমস্ত পুরুষার্থ বা মনস্কামনা পূরণকারিণী। হে শরণদাত্রী, ত্রিনয়নী, গৌরী নারায়ণী, তোমাকে প্রণাম জানাই।
নমঃ সৃষ্টিস্থিতিবিনাশানাং শক্তিভূতে সনাতনি।গুণাশ্রয়ে গুণময়ে নারায়ণি নমোহস্তু তে।।শরণাগতদীনার্তপরিত্রাণপরায়ণে।সর্বস্যার্তিহরে দেবি নারায়ণি নমোহস্তু তে।।
- উচ্চারণ অর্থ: হে সনাতনী দেবী, তুমিই জগৎ সৃষ্টি, স্থিতি ও বিনাশের আদি শক্তি। গুণসমূহের আশ্রয় রূপিণী নারায়ণী, তোমাকে প্রণাম। হে শরণাগত, দীন ও আর্ত মানুষদের রক্ষাকর্ত্রী এবং সকলের দুঃখ-কষ্ট হরণকারিণী দেবী, তোমাকে প্রণাম জানাই।
সঙ্কটে ত্বং মহামায়ে ব্রতসূত্রং ইদং তব।বধ্নামি বাহুমূলেঽহং বরং দেহি যথেপ্সিতং।।
- উচ্চারণ অর্থ: হে মহামায়া, সংকটকালে তুমিই একমাত্র রক্ষাকর্ত্রী। তোমার এই ব্রতের পবিত্র সুতো আমি আমার বাহুমূলে ধারণ করছি। কৃপা করে তুমি আমার মনের সকল বাসনা পূরণ করো এবং সমস্ত বিপদ থেকে আমাকে রক্ষা করো।
- নিয়ম: সাধারণত মেয়েরা এই সুতো বাম হাতে এবং ছেলেরা ডান হাতে ধারণ করেন।
বিপত্তারিণী ব্রতের পৌরাণিক ইতিহাস ও গল্প
বিপত্তারিণী ব্রতের প্রচলন নিয়ে মূলত দুটি জনপ্রিয় কাহিনী প্রচলিত আছে। একটি বিষ্ণুপুরের রাজপরিবারের ঐতিহাসিক লোকগাথা এবং অন্যটি স্বয়ং দেবী পার্বতীর এক পৌরাণিক রূপভেদ।
১. মল্লভূমের (বিষ্ণুপুর) রাজপরিবারের কাহিনী
সবচেয়ে প্রচলিত লোকগাথাটি জড়িয়ে আছে পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া জেলার বিষ্ণুপুরের মল্ল রাজবংশের সাথে।
অনেক বছর আগে বিষ্ণুপুরে এক মল্ল রাজা রাজত্ব করতেন। সেই রাজ্যে এক চামার (মুচি) পরিবার বাস করত। মল্ল রাজপরিবারের হিন্দু নিয়ম অনুযায়ী গোমাংস ভক্ষণ বা স্পর্শ করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ছিল। কিন্তু একদিন সেই চামার পরিবারের এক নারী রানীর সাথে দেখা করতে আসেন। কথায় কথায় তিনি রানীর কাছে গরুর মাংসের স্বাদের প্রশংসা করেন। কৌতুহলী হয়ে রানীও সেই মাংসের স্বাদ পরখ করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন।
রানীর আদেশে সেই চামার নারী গোপনে রাজপ্রাসাদে গরুর মাংস নিয়ে আসেন। কিন্তু প্রাসাদের অন্য রক্ষীরা বিষয়টি টের পেয়ে যান এবং রাজা জানতে পারেন যে অন্তপুরে নিষিদ্ধ মাংস আনা হয়েছে। ক্রুদ্ধ রাজা স্বয়ং রানীকে পরীক্ষা করার জন্য অন্তপুরের দিকে রওনা হন।
রানী যখন বুঝতে পারেন যে রাজা আসছেন এবং তাঁর অপরাধ ধরা পড়লে চরম শাস্তি (এমনকি মৃত্যুদণ্ডও) হতে পারে, তখন তিনি ভয় পেয়ে যান। নিরুপায় হয়ে তিনি দেবী দুর্গার শরণাপন্ন হন এবং জোড়হাতে প্রার্থনা করেন যেন মা তাঁর সম্মান রক্ষা করেন এবং এই মহাবিপদ থেকে উদ্ধার করেন।
রাজা যখন রানীর ঘরে প্রবেশ করেন এবং কাপড়ে ঢাকা পাত্রটি দেখতে পান, তখন তিনি রানীকে জিজ্ঞেস করেন ওটার ভেতরে কী আছে। রানী ভয়ে ভয়ে বলেন যে ওতে ফুল ও ফল রয়েছে। রাজা যখন নিজে পাত্রের ঢাকাটি তোলেন, তখন দেবীর অলৌকিক মহিমায় সেই মাংসের টুকরোগুলো রক্তলাল জবা ফুল এবং সুমিষ্ট ফলে পরিণত হয়।
রানী বুঝতে পারেন মা দুর্গা নিজেই এসে তাঁর সম্মান ও প্রাণ রক্ষা করেছেন। দেবী বিপদে তার ডাক শুনেছেন এবং উদ্ধার করেছেন বলেই সেদিন থেকে মা দুর্গার এই রূপের নাম হয় 'বিপত্তারিণী'। এই ঘটনার পর থেকেই রানী রাজ্যে এই ব্রত উদযাপন শুরু করেন, যা পরবর্তীতে সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে।
২. দেবী পার্বতীর অসুর বধের কাহিনী
অন্য একটি পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে, একবার 'শুম্ভ' ও 'নিশুম্ভ' নামের দুই শক্তিশালী অসুরের অত্যাচারে স্বর্গ-মর্ত্য কেঁপে উঠেছিল। তারা দেবতাদের স্বর্গচ্যুত করে। তখন দেবতারা দেবী পার্বতীর স্তব করেন। দেবতাদের কাতর প্রার্থনায় সাড়া দিয়ে দেবী পার্বতী নিজের কৃষ্ণবর্ণ কোষ থেকে এক পরম সুন্দরী ও তেজস্বী দেবীর সৃষ্টি করেন, যিনি 'কৌশিকী' নামে পরিচিত হন। এই কৌশিকী দেবীই পরবর্তীতে অসুরদের বধ করে দেবতাদের মহাবিপদ থেকে উদ্ধার করেন। বিপদে ত্রাণ করেছিলেন বলেই তিনি বিপত্তারিণী।
ব্রতের আচার ও তাৎপর্য
এই ব্রতের মূল উদ্দেশ্য হলো পরিবারকে সমস্ত অশুভ শক্তি ও বিপদ-আপদ থেকে রক্ষা করা।
লাল সুতো বা ডোর: এই ব্রতের প্রধান অঙ্গ হলো ১৩টি গিঁটযুক্ত একটি লাল সুতো (যাকে বিপত্তারিণী ডোর বলা হয়)। ব্রতকথা শোনার পর মহিলারা এই সুতোটি পুরুষদের ডান হাতে এবং মহিলাদের বাম হাতে বেঁধে দেন।
১৩ সংখ্যার গুরুত্ব: এই পুজোয় ১৩টি ফল, ১৩টি লুচি এবং ১৩টি মিষ্টি নৈবেদ্য হিসেবে অর্পণ করার নিয়ম রয়েছে।
বিপত্তারিণী ব্রত কেবল একটি ধর্মীয় আচার নয়, এটি বিশ্বাসের এমন এক প্রতীক যা মানুষকে প্রতিকূল পরিস্থিতিতে ধৈর্য ধরতে এবং শক্তির আরাধনা করতে শেখায়।
