পার্লামেন্টের সিংহ - ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় এর জীবনী

 ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়: সংক্ষিপ্ত জীবনপঞ্জি (১৮০১–১৯৫৩)


ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ১৯০১ সালের ৬ই জুলাই কলকাতায় এক অত্যন্ত সম্ভ্রান্ত ও বিদ্যানুরাগী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন বাংলার বাঘ নামে পরিচিত বিখ্যাত শিক্ষাবিদ ও কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় এবং মাতা যোগমায়া দেবী।

পারিবারিক পরিবেশেই তাঁর শিক্ষার শক্ত ভিত্তি তৈরি হয়েছিল। ১৯২১ সালে কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ইংরেজিতে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হয়ে বি.এ পাস করেন। এরপর ১৯২৩ সালে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে এম.এ ডিগ্রি অর্জন করেন—সে বছরও তিনি প্রথম স্থান অধিকার করেছিলেন। ১৯২৪ সালে পিতার আকস্মিক মৃত্যুর পর তিনি আইন শিক্ষায় মন দেন এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি.এল ডিগ্রি লাভ করেন। পরবর্তীতে ১৯২৬ সালে তিনি ইংল্যান্ডে যান এবং 'লিংকনস ইন' (Lincoln's Inn) থেকে ব্যারিস্টারি পাস করেন।

ব্যক্তিগত জীবনে ১৯২২ সালে তিনি সুধা দেবীর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁদের চার সন্তান ছিল। কিন্তু মাত্র ১১ বছরের দাম্পত্য জীবনের পর ১৯৩৩ সালে সুধা দেবীর অকাল প্রয়াণ ঘটে। মাত্র ৩২ বছর বয়সে স্ত্রীবিয়োগের পর শ্যামাপ্রসাদ নিজের সম্পূর্ণ জীবন শিক্ষা, সমাজসেবা ও দেশের রাজনীতিতে উৎসর্গ করেন।

কম প্রচলিত ও বিস্তারিত ঐতিহাসিক তথ্যসমূহ

রাজনীতিবিদ ও সমাজসংস্কারক হিসেবে ডঃ মুখোপাধ্যায়ের বহুমুখী ব্যক্তিত্বের এমন কিছু কম প্রচলিত অধ্যায় নিচে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো যা সাধারণত ইতিহাসের মূল পাতায় কম স্থান পায়:

১. শিক্ষাক্ষেত্রে সর্বকনিষ্ঠের রেকর্ড ও মাতৃভাষার প্রতি টান

পিতার মৃত্যুর পর তরুণ বয়সেই ডঃ মুখোপাধ্যায় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক দায়িত্ব নেন। মাত্র ৩৩ বছর বয়সে (১৯৩৪ সালে) তিনি এই বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিযুক্ত হন, যা ছিল তৎকালীন সময়ে এক অনন্য রেকর্ড।

  • বাংলা ভাষার গৌরব পুনরুদ্ধার: তিনি উপাচার্য থাকাকালীনই কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন বা কনভোকেশনে প্রথমবারের মতো মাতৃভাষা বাংলায় ভাষণ দেওয়ার প্রথা চালু করেন। এর আগে সমস্ত আনুষ্ঠানিকতা কেবল ইংরেজিতেই হতো। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে সমাবর্তন মঞ্চে বাংলায় প্রধান বক্তব্য রাখার জন্য তিনিই আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন, যা বাংলার শিক্ষাচর্চায় একটি ঐতিহাসিক ঘটনা।

  • বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি: ভারতীয় বিজ্ঞানীদের গবেষণার প্রসারে তিনি সি. ভি. রমন এবং সত্যেন্দ্রনাথ বসুর মতো বিজ্ঞানীদের গবেষণায় প্রশাসনিক ও পরিকাঠামোগত স্তরে প্রভূত সাহায্য করেছিলেন।

২. আধুনিক ভারতের প্রথম সারির 'শিল্প-স্থপতি'

স্বাধীন ভারতের প্রথম "শিল্প ও সরবরাহ" (Industry and Supply) মন্ত্রী হিসেবে ডঃ মুখোপাধ্যায় ভারতের আধুনিক শিল্পায়নের শক্তিশালী ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন। অনেকেই হয়তো জানেন না যে, ভারতের বর্তমানের কয়েকটি প্রথম সারির ভারী শিল্প প্রকল্প তাঁরই মস্তিষ্কপ্রসূত ও বাস্তবায়িত পরিকল্পনা:

  • চিত্তরঞ্জন লোকোমোটিভ ওয়ার্কস (Chittaranjan Locomotive Works): ভারতের এই বিখ্যাত রেল ইঞ্জিন কারখানাটি তাঁর দূরদর্শী পরিকল্পনার ফসল।

  • সিন্ড্রি সার কারখানা (Sindri Fertilizer Factory): স্বাধীন ভারতের কৃষিক্ষেত্রে স্বনির্ভরতা আনতে এই সার কারখানা স্থাপনের পেছনে তাঁর মূল ভূমিকা ছিল।

  • হিন্দুস্তান ক্যাবলস ও দামোদর ভ্যালি কর্পোরেশন (DVC): নদী উপত্যকা পরিকল্পনা এবং দেশের প্রথম সারির উৎপাদন পরিকাঠামো তাঁর মন্ত্রিত্বের সময়কালেই রূপরেখা পায়।

  • দুর্গাপুর স্টিল প্ল্যান্টের সূচনা পর্ব: ১৯৪৯ সালে তৎকালীন আই.সি.এস অফিসার করুণাকেতন সেনকে সঙ্গে নিয়ে তিনি দুর্গাপুর অঞ্চলের শিল্পায়নের প্রাথমিক খসড়া প্রস্তুত করেছিলেন, যা পরবর্তীতে একটি সফল ইস্পাত নগরী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

৩. কবি কাজী নজরুল ইসলামের পাশে দাঁড়ানো

তৎকালীন বাংলার রাজনৈতিক ডামাডোলের মধ্যেও ডঃ মুখোপাধ্যায়ের মানবিক ও সাহিত্যিক সত্তা ছিল অত্যন্ত উজ্জ্বল। কবি কাজী নজরুল ইসলাম যখন পক্ষাঘাতগ্রস্ত ও গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন, তখন মুসলিম লীগের অনেক মন্ত্রী বা তৎকালীন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরা সেভাবে এগিয়ে আসেননি। সেই চরম সংকটের সময়ে ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ব্যক্তিগত উদ্যোগে একটি 'নজরুল চিকিৎসা কমিটি' গঠন করেন এবং কবির চিকিৎসার জন্য অর্থ সংগ্রহের ব্যবস্থা করেন। রাজনীতির ঊর্ধ্বে গিয়ে সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতি তাঁর এই শ্রদ্ধাবোধ ইতিহাসের একটি অনন্য উদাহরণ।

৪. হিন্দু মহাসভা ত্যাগ এবং অসাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গির প্রয়াস

অনেকে তাঁকে কেবল কট্টর ডানপন্থী মনে করলেও, তাঁর রাজনৈতিক বিবর্তন ছিল বেশ চমকপ্রদ। ১৯৪৮ সালে মহাত্মা গান্ধীর হত্যাকাণ্ডের পর তিনি হিন্দু মহাসভাকে পরামর্শ দিয়েছিলেন যে, তারা যেন নিজেদের কেবল হিন্দুদের জন্য সীমাবদ্ধ না রেখে সব ধর্মের ভারতীয়দের জন্য দরজা খুলে দেয় এবং একটি পুরোদস্তুর রাজনৈতিক দল হিসেবে কাজ করে। কিন্তু মহাসভা তাঁর এই প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায়, নিজের আদর্শগত অবস্থানের কারণে তিনি হিন্দু মহাসভার সভাপতির পদ এবং দল— দুই-ই ত্যাগ করেন। পরবর্তীতে ১৯৫১ সালে সম্পূর্ণ নতুন চিন্তাধারা নিয়ে তিনি 'ভারতীয় জনসঙ্ঘ' প্রতিষ্ঠা করেন।

৫. সংবিধান সভা ও 'পার্লামেন্টের সিংহ' উপাধি

ভারতের সংবিধান রচনার ক্ষেত্রে ডঃ মুখোপাধ্যায়ের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তিনি স্বাধীন ভারতের প্রথম লোকসভায় যখন বিরোধী আসনে বসেন, তখন নেহেরু সরকারের বিভিন্ন নীতির (বিশেষ করে তোষণ নীতি এবং কাশ্মীর নীতি) বিরুদ্ধে তাঁর যুক্তিপূর্ণ, ওজস্বী ও ধারালো বক্তব্য পুরো সংসদকে কাঁপিয়ে দিত। তাঁর এই অসামান্য বাগ্মিতা এবং আপসহীন লড়াকু মনোভাবের কারণে তাঁকে সংসদের ভেতরে ও বাইরে 'পার্লামেন্টের সিংহ' (Lion of Parliament) বলে অভিহিত করা হতো।

পশ্চিমবঙ্গ গঠনে ঐতিহাসিক ভূমিকা

১৯৪৭ সালের দেশভাগের সময় বাংলা যাতে সম্পূর্ণ পাকিস্তানের অংশ না হয়ে যায় এবং বাঙালি হিন্দুদের জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয় ও রাজ্য থাকে, তার জন্য তিনি পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য গঠনে জোরালো নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তৎকালীন আইনসভার ভোটের সমীকরণ ও আন্দোলনকে সঠিক দিশা দিয়ে আজকের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যটি ম্যাপে ধরে রাখার পেছনে তাঁর অবদান ছিল অনস্বীকার্য।

১৯৫৩ সালের মে মাসে কাশ্মীরে পারমিট রাজের (তৎকালীন সময়ে কাশ্মীরে ঢুকতে বিশেষ অনুমতি লাগত) বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে গিয়ে তিনি গ্রেপ্তার হন এবং ২৩শে জুন শ্রীনগরে বন্দি অবস্থায় রহস্যজনকভাবে তাঁর মৃত্যু হয়, যা আজও ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম এক অমীমাংসিত রহস্য।