মহালয়া ও শনি অমাবস্যায় কি করবেন ? কি করবেন না ?

এক নজরে: ১০ অক্টোবর ২০২৬, শনিবার — মহালয়া (সর্বপিতৃ অমাবস্যা)। শনিবারে অমাবস্যা পড়ায় এ বছর দিনটি একইসঙ্গে শনি অমাবস্যা। পিতৃপক্ষের সমাপ্তি, দেবীপক্ষের সূচনা — আর শনিদেবের বিশেষ দিন, তিনটি যোগ একসঙ্গে।


মহালয়া ২০২৬: কেন এবারের দিনটি এত বিশেষ?

প্রতি বছর ভাদ্র মাসের পূর্ণিমার পরের দিন থেকে শুরু হয় পিতৃপক্ষ, আর তার শেষ দিন অমাবস্যা — যাকে আমরা বাংলায় বলি মহালয়া। শাস্ত্রে এর নাম সর্বপিতৃ অমাবস্যা, অর্থাৎ সকল পিতৃপুরুষের জন্য নির্দিষ্ট অমাবস্যা। যাঁদের মৃত্যুতিথি জানা নেই, কিংবা পিতৃপক্ষের অন্য দিনে যাঁদের শ্রাদ্ধ-তর্পণ করা হয়নি, তাঁদের সবার উদ্দেশ্যে এই দিনে জল ও পিণ্ড নিবেদন করা যায়।

২০২৬ সালে মহালয়া পড়েছে শনিবার। শনিবারে অমাবস্যা হলে তাকে বলা হয় শনি অমাবস্যা বা শনৈশ্চরী অমাবস্যা। জ্যোতিষ মতে শনি কর্মফলদাতা, আর অমাবস্যা পূর্বপুরুষ ও কর্মশুদ্ধির তিথি। তাই এবারের মহালয়া একসঙ্গে পিতৃদোষ শান্তি ও শনিদোষ শান্তি — দুটোর জন্যই অত্যন্ত শক্তিশালী দিন বলে মনে করা হচ্ছে। এ বছর দিনটি দুর্লভ, কারণ সব বছর মহালয়া শনিবারে পড়ে না।

পরদিন, ১১ অক্টোবর থেকে শুরু হবে দেবীপক্ষ ও শারদীয় নবরাত্রি।

তারিখ ও তিথি

তারিখ১০ অক্টোবর ২০২৬, শনিবার
তিথিআশ্বিন কৃষ্ণ অমাবস্যা (মহালয়া / সর্বপিতৃ অমাবস্যা / শনি অমাবস্যা)
অমাবস্যা ৯ অক্টোবর রাত ৮টা ৫৯থেকে ১০ অক্টোবর রাত প্রায় সাড়ে ৮টা ৩৪ পর্যন্ত
তর্পণের সময়১০ অক্টোবর ভোর থেকে দুপুরের মধ্যে (শ্রাদ্ধের জন্য কুতুপ মুহূর্ত — মধ্যাহ্ন, প্রায় ১১:৪৫–১২:৩০)

বিভিন্ন পঞ্জিকায় তিথির শুরু-শেষের সময়ে কিছুটা পার্থক্য থাকে। সঠিক সময়ের জন্য স্থানীয় পঞ্জিকা (বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত / গুপ্তপ্রেস) বা পুরোহিতের পরামর্শ নিন।

✅ মহালয়া–শনি অমাবস্যায় কী করবেন

১. ভোরে স্নান ও তর্পণ

সূর্যোদয়ের আগে উঠে স্নান করুন। সম্ভব হলে গঙ্গা বা কোনো নদীর ঘাটে, নইলে বাড়িতেই জলে সামান্য গঙ্গাজল ও কালো তিল মিশিয়ে স্নান করুন। তারপর দক্ষিণমুখী হয়ে কুশ, কালো তিল ও জল দিয়ে পিতৃপুরুষের নাম স্মরণ করে তর্পণ করুন। মন্ত্র জানা না থাকলে শুধু "ওঁ পিতৃভ্যো নমঃ" বলে শ্রদ্ধার সঙ্গে জল অর্পণ করলেও চলে।

মনে রাখবেন, আগে ধারণা ছিল কেবল পুরুষরাই তর্পণ করতে পারেন — এখন সেই বাধা আর মানা হয় না, মেয়েরাও তর্পণ করতে পারেন।

২. পিতৃপুরুষের উদ্দেশ্যে শ্রাদ্ধ ও পিণ্ডদান

যাঁদের মৃত্যুতিথি জানা নেই বা পিতৃপক্ষে যাঁদের শ্রাদ্ধ করা হয়নি, তাঁদের জন্য আজই শেষ সুযোগ। পুরোহিতের সাহায্যে শ্রাদ্ধ বা পিণ্ডদান করতে পারেন।

৩. পঞ্চবলি — জীবজন্তুকে খাবার দিন

বিশ্বাস আছে, পিতৃপুরুষ এই দিনে যে-কোনো রূপে বাড়িতে আসতে পারেন। তাই গরু, কুকুর, কাক, পিঁপড়ে ও অতিথির জন্য খাবারের অংশ আলাদা করে রাখুন। বিশেষ করে কাককে খাওয়ানো পিতৃকার্যে শুভ বলে মানা হয়।

৪. অন্নদান ও বস্ত্রদান

ব্রাহ্মণ ও দরিদ্রদের অন্ন, বস্ত্র দান করুন। পিতৃপক্ষের শেষ দিনে দান করলে পিতৃঋণ থেকে মুক্তি মেলে — এমনটাই শাস্ত্রীয় বিশ্বাস।

৫. শনিদেবের পূজা ও শনির দান

যেহেতু দিনটি শনিবার, তাই শনিমন্দিরে গিয়ে শনিদেবকে সরষের তেল বা তিলের তেল নিবেদন করুন। শনির প্রিয় দান — কালো তিল, কালো কলাই (বিউলি ডাল), সরষের তেল, কালো কাপড়, লোহার জিনিস — সাধ্যমতো দরিদ্রকে দান করুন। যাঁরা শনির সাড়েসাতি বা আড়াইয়ার মধ্যে আছেন, তাঁদের জন্য দিনটি বিশেষ।

শনিমন্ত্র: "ওঁ শং শনৈশ্চরায় নমঃ" — ১০৮ বার জপ করতে পারেন।

৬. অশ্বত্থ গাছে প্রদীপ

অশ্বত্থ (পিপুল) গাছ পিতৃপুরুষ ও শনিদেব — দুজনেরই প্রিয় বলে মানা হয়। দুপুরে গাছের গোড়ায় কালো তিল মেশানো জল বা দুধ দিন, আর সন্ধ্যায় সরষের তেলের প্রদীপ জ্বেলে সাতবার প্রদক্ষিণ করুন।

৭. ছায়াদান

একটি লোহার বা কাঁসার বাটিতে সরষের তেল নিয়ে তাতে নিজের মুখ দেখুন, তারপর তেলসহ বাটিটি শনিমন্দিরে বা কোনো অভাবী মানুষকে দান করুন। একে বলে ছায়াদান — শনিদোষ শান্তির প্রচলিত উপায়।

৮. নিরামিষ আহার ও সংযম

সারাদিন নিরামিষ, সাত্ত্বিক খাবার খান। অনেকে উপবাস রাখেন। পিতৃপুরুষের প্রিয় খাবার রান্না করে প্রথমে তাঁদের উদ্দেশ্যে নিবেদন করুন।

৯. ভোরে মহিষাসুরমর্দিনী শুনুন

বাঙালির মহালয়া মানেই ভোর চারটেয় রেডিওতে "মহিষাসুরমর্দিনী"। পিতৃপক্ষের বিদায় আর দেবীপক্ষের আগমনী — এই দুইয়ের সন্ধিক্ষণে চণ্ডীপাঠ শুনে দিন শুরু করুন।

❌ এই দিনে কী করবেন না

  • আমিষ, মদ, তামাক নয় — মাছ-মাংস-ডিম, পেঁয়াজ-রসুন, মদ ও ধূমপান এড়িয়ে চলুন।
  • কিছু খাবার বর্জনীয় — প্রচলিত মতে এদিন মসুর ডাল, ছোলা, লাউ, শসা, মুলো, জিরে, কালো নুন ও বাসি খাবার খাওয়া উচিত নয়।
  • চুল-দাড়ি-নখ কাটবেন না — বিশেষত যিনি তর্পণ বা শ্রাদ্ধ করছেন।
  • কোনো প্রাণী বা ভিক্ষুককে অপমান নয় — বাড়িতে আসা কুকুর, বিড়াল, গরু, কাক বা কোনো অভাবী মানুষকে তাড়িয়ে দেবেন না। বিশ্বাস, পিতৃপুরুষ যে-কোনো রূপে আসতে পারেন।
  • ঝগড়া, কটু কথা নয় — বাড়িতে অশান্তি, গালিগালাজ বা বড়দের অসম্মান এড়িয়ে চলুন। শনিদেব ন্যায়ের দেবতা, অসৎ আচরণ তাঁর অপছন্দ।
  • অশ্বত্থ, বট, নিম গাছ কাটবেন না — এতে পিতৃদোষ হয় বলে মানা হয়।
  • শনিবারে তেল ও লোহা কেনা নয় — প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী এদিন সরষের তেল, লোহার জিনিস কেনা থেকে বিরত থাকুন। এগুলো আগের দিন কিনে রাখুন, শনিবার শুধু দান করুন।
  • পিতৃকার্যের আগে নতুন শুভ কাজ শুরু নয় — গৃহপ্রবেশ, বিয়ের পাকা কথা, নতুন ব্যবসা শুরু ইত্যাদি দেবীপক্ষ শুরু হওয়ার পর করাই শ্রেয়।
  • অন্যের জমিতে তর্পণ নয় — শাস্ত্রমতে নিজের জমিতে, নদীর ঘাটে বা পবিত্র তীর্থে তর্পণ করা উচিত।
  • অহংকার বা লোক দেখানো দান নয় — দান ও শ্রাদ্ধ করুন শ্রদ্ধা ও বিনয়ের সঙ্গে।

শেষ কথা

মহালয়া শুধু একটি তিথি নয় — এটি কৃতজ্ঞতার দিন। যাঁদের জন্য আমরা আজ আছি, তাঁদের স্মরণ করার দিন। এবার শনিবারের যোগে দিনটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ। আড়ম্বর নয়, এক অঞ্জলি জল, এক মুঠো তিল আর আন্তরিক শ্রদ্ধা — এটুকুই পিতৃপুরুষের কাছে সবচেয়ে বড় নিবেদন। পিতৃপুরুষের আশীর্বাদ আর শনিদেবের কৃপায় সবার জীবন শান্তিময় হোক। শুভ মহালয়া।

দ্রষ্টব্য: এই লেখাটি শাস্ত্রীয় বিশ্বাস ও প্রচলিত লোকাচারের ভিত্তিতে তৈরি। পরিবার ও অঞ্চলভেদে নিয়মে পার্থক্য থাকতে পারে। নির্দিষ্ট বিধির জন্য নিজের পারিবারিক পুরোহিতের পরামর্শ নিন।